নীরবতা অসহায়ত্ব নয়— আল্লাহ নিজেই যখন প্রতিশোধ নেন


 



হজরত আলী (রা.) বলেছেন— ‘যদি তুমি কাউকে কষ্ট দাও, আর সে যদি চুপ থাকে, তবে তার নীরবতাকে ভয় করো; কারণ এর বিচার স্বয়ং আল্লাহ করবেন।’ এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর বাণীটি মানুষের জীবনের এক ভয়ংকর সত্য আমাদের সামনে তুলে ধরে— সব প্রতিবাদের শব্দ হয় না, সব আর্তনাদ শোনা যায় না; কিন্তু কোনো কষ্টই আল্লাহর দৃষ্টির বাইরে থাকে না।



নীরবতা মানেই দুর্বলতা নয়

অনেক সময় আমরা ভাবি, কেউ চুপ থাকলে সে হয়তো দুর্বল, অসহায় কিংবা প্রতিবাদ করার ক্ষমতা রাখে না; কিন্তু ইসলাম আমাদের শেখায়— নীরবতা অনেক সময় আল্লাহর কাছে সোপর্দ করা এক গভীর অভিযোগ। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَلَا تَحْسَبَنَّ اللَّهَ غَافِلًا عَمَّا يَعْمَلُ الظَّالِمُونَ

‘জালিমরা যা করে, আল্লাহ তা থেকে উদাসীন— এ কথা কখনোই মনে করো না।’ (সুরা ইবরাহিম: আয়াত ৪২)

মাজলুমের দোয়া: আকাশ কাঁপানো আবেদন

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

اتَّقِ دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ، فَإِنَّهُ لَيْسَ بَيْنَهَا وَبَيْنَ اللَّهِ حِجَابٌ

‘মাজলুমের দোয়া থেকে বেঁচে থাকো, কারণ তার দোয়ার সঙ্গে আল্লাহর কোনো পর্দা থাকে না।’ (বুখারি ২৪৪৮)

যে ব্যক্তি কষ্ট দিয়েও নিশ্চিন্ত থাকে, সে আসলে ভয়াবহ ভুলের মধ্যে আছে। কারণ আল্লাহ নীরবতার ভাষা বোঝেন। আর যে কষ্ট পেয়ে চুপ থাকে, সে হয়তো মানুষের কাছে কিছু বলছে না— কিন্তু তার হৃদয়ের আর্তনাদ সরাসরি আল্লাহর দরবারে পৌঁছে যায়।



আল্লাহর বিচার দেরিতে হলেও ভুল হয় না

দুনিয়াতে অনেক সময় দেখা যায়— অত্যাচারী দাপটের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়, আর নির্যাতিত মানুষ নীরবে কষ্ট সহ্য করে; কিন্তু কুরআন আমাদের আশ্বস্ত করে—

إِنَّ رَبَّكَ لَبِالْمِرْصَادِ

‘নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক ওতপেতে আছেন।’ (সুরা আল-ফজর: আয়াত ১৪)

আল্লাহ কখনো তাড়াহুড়া করেন না, আবার কাউকে ভুলেও যান না। তার বিচার সময়মতোই আসে—হোক তা দুনিয়াতে কিংবা আখেরাতে। তাই ক্ষমতা নয়, তাকওয়াই প্রকৃত নিরাপত্তা। অনেকেই ক্ষমতা, প্রভাব বা পরিচয়ের জোরে অন্যকে কষ্ট দিয়ে ভাবে— ‘আমার কিছুই হবে না।’ অথচ ইসলাম বলে— নিরাপত্তা আসে তাকওয়া থেকে, ক্ষমতা থেকে নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

الظُّلْمُ ظُلُمَاتٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ

‘জুলুম কেয়ামতের দিন ঘোর অন্ধকার হয়ে দাঁড়াবে।’ (মুসলিম ২৫৭৯)

নীরব মানুষদের জন্য আশার বাণী

যারা কষ্ট পেয়েও চুপ থাকেন, অপমান সহ্য করেও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখেন— এই ইসলামিক সত্য তাদের জন্য সান্ত্বনার—

وَسَيَعْلَمُ الَّذِينَ ظَلَمُوا أَيَّ مُنقَلَبٍ يَنقَلِبُونَ

‘যারা জুলুম করেছে, তারা অচিরেই জানতে পারবে তারা কোন পরিণতির দিকে ফিরে যাবে।’ (সুরা আশ-শুআরা: আয়াত ২২৭)

নিজের জন্য এক মুহূর্তের প্রশ্ন—?

আজ যদি আমরা কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকি— কথায়, আচরণে, ক্ষমতার অপব্যবহারে— আর সে যদি চুপ থাকে, তবে কি আমরা নিশ্চিন্ত থাকতে পারি?

হজরত আলী (রা.)–এর বাণী আমাদের সতর্ক করে দেয়— ‘মানুষের নীরবতা নয়, আল্লাহর বিচারকেই ভয় করো।’

নীরব চোখের জল, চুপচাপ সহ্য করা অপমান, আর নিঃশব্দ কষ্ট— সবকিছুর হিসাব আল্লাহ রাখেন। তাই কাউকে কষ্ট দেওয়ার আগে মনে রাখুন, হয়তো সে চুপ থাকবে, কিন্তু আল্লাহ নীরব থাকবেন না।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url